
লেখক : মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন
শাওয়ালের বাঁকা চাঁদ আকাশে উঠলে চারদিকে আনন্দের রোল পড়ে। আকাশ মেঘলা তারপরেও সন্ধ্যার পরে রেডিও-টেলিভিশনে বেজে ওঠে খুশির গান। চারদিকে আন্দদের আগমানী সুর সুর পরে যাবে। কিন্তু এই খুশির জোয়ারে কি সবাই ভাসতে পারে? কারো কাছে ঈদ মানে নতুন পোশাকের ঘ্রাণ, আর কারো কাছে ঈদ মানে বুকের ভেতর জমে থাকা এক দলা দীর্ঘশ্বাস। ঈদ তো বারবার ফিরে আসে তার নিয়ম মেনে, কিন্তু সবার জীবন কি একই নিয়মে চলে? বিষাদসিন্ধুর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কাছে ঈদ মানে এক পশলা নোনা জল আর এক বুক হাহাকার।হে ঈদ, তুমি কেন বারবার ফিরে আসো? তুমি যখন দরজায় কড়া নাড়ো, তখন আনন্দ নয়, বরং এক অজানা আতঙ্ক দানা বাঁধে অনেকের মনে। যে বাবা তার সন্তানের জন্য একটি নতুন জামা কেনার সামর্থ্য রাখে না, তার কাছে তোমার আগমন মানেই লজ্জায় কুঁকড়ে যাওয়া। যে মা তার এতিম সন্তানের মুখে একটু ভালো খাবার তুলে দিতে পারে না, তার কাছে তোমার হাসি মানেই কলিজায় তপ্ত শলার আঘাত। তুমি কি জানো, তোমার আগমনে কত অভাবী মানুষের বুক কাঁপে? তারা তোমাকে আলিঙ্গন করতে চায় না, বরং পালাতে চায় তোমার এই জৌলুস থেকে।ঈদের আনন্দ পূর্ণতা পায় প্রিয়জনের উপস্থিতিতে। কিন্তু যাদের ঘর আজ শূন্য, যাদের প্রিয় মানুষটি মাটির নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত, তাদের কাছে ঈদ মানেই স্মৃতির দহন। ঈদের নামাজ শেষে যখন সবাই কোলাকুলি করে, তখন সেই মানুষটি ভিড়ের মাঝেও একা। তার ঝাপসা চোখের সামনে ভেসে ওঠে গত বছরের সেই হাসিমুখটি, যা আজ শুধুই ছবি। জায়নামাজে বসে মোনাজাতের সময় যখন কান্নার নোনা জলে দাড়ি ভিজে যায়, তখন সেই হাহাকার আকাশের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। তাদের জন্য ঈদ কোনো উৎসব নয়, বরং বিচ্ছেদের এক নিষ্ঠুর স্মারক।আজ যখন আমরা ঈদের আনন্দের কথা ভাবছি, তখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফিলিস্তিনের ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া জনপদ। সেখানে ঈদের চাঁদ আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে না, আসে আরও একমুঠো বিভীষিকা নিয়ে। আকাশ সেখানে মেঘলা নয়, বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। রেডিও-টেলিভিশনে খুশির গানের বদলে সেখানে প্রতিধ্বনিত হয় ড্রোন আর বোমার গর্জন। সেই জনপদে আজ কোনো শিশুর হাতে নতুন পোশাক নেই, আছে শুধুই কাফনের কাপড়। কোনো মায়ের কোলে আজ সন্তান নেই, আছে শুধুই হাড় জিরজিরে নিথর দেহ। ফিলিস্তিনের শিশুদের কাছে ঈদের আনন্দ মানে কী, তা তারা জানে না। তাদের শৈশব আজ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেছে। স্বজন হারানো নারীদের আর্তনাদে আজ আকাশ-বাতাস ভারী। তাদের জীবনে ঈদ নেই, আছে শুধুই বেঁচে থাকার সংগ্রাম আর হারানো দিনের স্মৃতি। শহরের আলোকসজ্জা আর আতশবাজির নিচে চাপা পড়ে যায় হাজারো মানুষের নীরব কান্না। ফুটপাতে শুয়ে থাকা শিশুটি যখন দেখে তার বয়সী কেউ দামি গাড়িতে চড়ে ঈদের আনন্দ করছে, তখন তার নিষ্পাপ মনে যে ক্ষত তৈরি হয়, তা কোনো প্রলেপেই সারে না। মধ্যবিত্তের সেই আত্মমর্যাদাশীল মানুষটি, যে হাত পাততে পারে না আবার অভাবও সইতে পারে না, তার কাছে ঈদ মানে এক নিভৃত কারাগার। দরজার খিল এঁটে সে যখন একা কাঁদে, তখন তোমার আনন্দ তাকে উপহাস করে যায়।অনেকের কাছে ঈদ মানেই দূর পরবাসে একাকী বসে থাকা। পরিবারের সাথে কথা বলতে গিয়ে যখন কণ্ঠ রোধ হয়ে আসে, লোনা জল আড়াল করতে যখন স্ক্রিন থেকে মুখ সরিয়ে নিতে হয়, তখন ঈদ হয়ে ওঠে এক বিশাল বোঝা। শেকড় ছিঁড়ে দূরে থাকা এই মানুষগুলোর কাছে ঈদের চাঁদ মানেই একরাশ নিঃসঙ্গতা। তারা তোমাকে আলিঙ্গন করতে চায়, কিন্তু শূন্যতা তাদের দুহাত বেঁধে রাখে। ঈদ তুমি আবার এলে তোমার মতো করে, কিন্তু সবার ভাগ্যে কি জুটল সেই একই আনন্দ? না, কারো কারো জন্য তুমি হলে কান্নার জল, কারো জন্য অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস। হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা এই ব্যথাগুলো প্রকাশের ভাষা পায় না। তবুও পৃথিবী চলে তার আপন গতিতে। হয়তো কোনো এক ঈদে সবার চোখে জল থাকবে না, সবাই তোমাকে বুক ভরে আলিঙ্গন করতে পারবে এই আশাটুকু নিয়েই বেঁচে থাকে মানুষ। কিন্তু এই বিষাদমাখা তোমার আগমনে শুধু এটুকুই বলা যায় "ঈদ, তুমি সবার জন্য আনন্দ নিয়ে আসলেও কারো কারো জন্য তুমি কেবলই এক লোনা জলের কাব্য। "হে ঈদ, তুমি এসো কিন্তু কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে নয়। তুমি এসো মানুষের মনের ভেতর এক বিশাল পরিবর্তনের ঢেউ হয়ে। যারা ক্লান্ত, যারা পরিশ্রান্ত, যারা জীবনের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে হাসতে ভুলে গেছে—তাদের তুমি ফিরিয়ে দিও হারানো সাহস। সইবার শক্তিটুকু যদি সাথে নিয়ে না আসো, তবে তোমার এই ক্ষণিকের আনন্দ কেবল আমাদের ক্ষত গুলোকে আরও বাড়িয়ে দেবে। তাই তুমি এসো এক পশলা বৃষ্টির মতো, যা তপ্ত হৃদয়ে প্রশান্তি দেবে এবং লড়বার নতুন শক্তি জোগাবে।