
আন্তর্জাতিক ডেস্ক |
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইসরাইলের প্রাণকেন্দ্র তেল আবিবে নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তেহরান। এই হামলায় প্রথমবারের মতো ব্যবহৃত হয়েছে মারণঘাতী ‘ক্লাস্টার ওয়ারহেড’ বা গুচ্ছ বোমা, যা আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের এই ক্রমবর্ধমান শিখা নিভানোর সব আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—ক্ষতিপূরণ ও পরাজয় স্বীকার না করা পর্যন্ত কোনো যুদ্ধবিরতি সম্ভব নয়।
মঙ্গলবার রাতের অন্ধকার চিরে ইরানের ভূখণ্ড থেকে ধেয়ে আসে একের পর এক শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র। ইরানি সংবাদমাধ্যম ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এবারের অভিযানে তারা তাদের তুরুপের তাস ‘খোররামশহর-৪’ এবং ‘কদর’ মডেলের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর বিশেষত্ব হলো এদের ‘ক্লাস্টার ওয়ারহেড’ বা গুচ্ছ বোমা প্রযুক্তি।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ-আকাশে পৌঁছে শত শত ক্ষুদ্র সাব-মিউনিশন বা ছোট ছোট বোমায় বিভক্ত হয়ে যায়। ফলে ইসরাইলের বহুল আলোচিত ‘আয়রন ডোম’ বা ‘ডেভিডস স্লিং’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একসঙ্গে এতগুলো লক্ষ্যবস্তুকে রুখতে ব্যর্থ হয়। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, তেল আবিবের অত্যন্ত জনবহুল এবং সামরিক গুরুত্বসম্পন্ন একটি এলাকায় এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আঘাত হেনেছে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে অন্তত দুইজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে, তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আলী লারিজানির মতো শীর্ষ নেতার মৃত্যু ইরানের জন্য একটি বড় ধাক্কা হলেও, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ইরান কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "ইসলামিক রিপাবলিকের ভিত অনেক গভীরে। লারিজানি বা অন্য কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার মৃত্যুতে আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ার প্রশ্নই ওঠে না।"
আরাগচি আরও জানান, শূন্য হওয়া পদগুলোতে ইতিমধ্যে নতুন নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পূর্ণ গতিতে চলছে। তার এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তেহরান যুদ্ধের এই দীর্ঘমেয়াদী ধাক্কা সামলানোর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত।
এদিকে যুদ্ধের মোড় ঘোরানো সবথেকে বড় খবরটি এসেছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছ থেকে। সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষ থেকে আসা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তেহরানের একটি উচ্চপদস্থ সূত্র জানিয়েছে, খামেনি মনে করেন এই যুদ্ধ এখন আর কেবল আত্মরক্ষার নয়, বরং অস্তিত্বের লড়াই।
সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বার্তায় তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, "যতক্ষণ না ইসরাইল এবং তাদের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধের পরাজয় মেনে নিচ্ছে এবং ইরানের অপূরণীয় ক্ষতির জন্য পূর্ণ ক্ষতিপূরণ প্রদান করছে, ততক্ষণ শান্তির কোনো আলোচনার সুযোগ নেই।" এই কঠোর অবস্থান বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, কারণ এর ফলে সংঘাত আঞ্চলিক যুদ্ধ থেকে বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
বাইরে যুদ্ধের দামামা চললেও ভেতরেও কঠোর অবস্থানে রয়েছে ইরান সরকার। সম্প্রতি মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে কুরোশ কেইভানি নামে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে তেহরান। অভিযোগ রয়েছে, কেইভানি ইরানের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত অতিগোপনীয় তথ্য ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাকে সরবরাহ করছিলেন। এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে ইরান তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে আপসহীন বার্তা দিল।
যুদ্ধের উত্তাপ থেকে বাদ যায়নি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোও। মঙ্গলবার তেহরানের আইআরজিসি সদর দপ্তর লক্ষ্য করে ইসরাইলি বিমান হামলার পরপরই ইরান দাবি করে যে, তারা বুশেহর পারমাণবিক কেন্দ্রের কাছে একটি প্রজেক্টাইল বা উড়ন্ত বস্তুকে আঘাত করে ভূপাতিত করেছে।
স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) দ্রুত এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, বুশেহর কেন্দ্রে কোনো কাঠামোগত ক্ষতি হয়নি এবং সেখান থেকে কোনো তেজস্ক্রিয় গ্যাস বা পদার্থ নির্গত হওয়ার প্রমাণ মেলেনি। সংস্থাটি উভয় পক্ষকে পারমাণবিক স্থাপনার ধারেকাছে হামলা না চালানোর জন্য কঠোর অনুরোধ জানিয়েছে।
সিএনএন-এর তথ্যমতে, গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ইসরাইলের অভ্যন্তরে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের ক্ষয়ক্ষতি ও নিহতের সঠিক সংখ্যা এখনও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন হলেও তা কয়েকশ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে সামান্য একটি ভুল পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে ছারখার করে দিতে পারে। বিশেষ করে ইরানের পক্ষ থেকে ক্লাস্টার বোমার ব্যবহার যুদ্ধের ব্যাকরণ বদলে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বা জাতিসংঘ এই আসন্ন মহাপ্রলয় রুখতে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে কি না।